শব্দ দূষণে অ’তিষ্ঠ: আলু, পিঁয়াজ বিক্রি থেকে শুরু করে ভিক্ষাবৃত্তিতেও ব্যবহার হচ্ছে মাইক

শিল্পনগরী খুলনা এখন ক্যানভাসের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে নানা ধরনের মাইকিং। প্রচার যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে অ’তিষ্ঠ নগরবাসী। আর এনিয়ে ক্ষো’ভ তৈরী হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।

ইতিমধ্যে এর প্র’তিবাদে নিরালা আবাসিক এলাকায় মাইকিং বন্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে এলাকাবাসী। ভোর থেকে আলু, পিঁয়াজ বিক্রি থেকে ভিক্ষাবৃত্তিতেও ব্যবহার হচ্ছে মাইক। ভিক্ষা করতে এখন আর কেউ মুখ দিয়ে ভিক্ষা চান না। আধুনিক ভাষায় ভিক্ষার শ্লোগান রেকর্ড করে মেমোরি কার্ডে ভরে মাইকে প্রচার করে ভিক্ষা চাওয়া হয়।

আর নগরীর খাবার দোকান থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্যবহার হচ্ছে মাইক। নেই কোন বা’ধা কিংবা প্র’তিবাদ। অনেকে বির’ক্ত হয়ে ঘরের জানালা দরজা বন্ধ রেখে শি’শুদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। ঘরে অ’সুস্থ কেউ থাকলে তাদের সমস্যা আরো বেশী। অনেক সময় বৃ’দ্ধ অ’সুস্থ হৃদরো’গের রো’গীদের জন্য শব্দদূষণ বাড়তি ঝুঁ’কি তৈরী করছে।

এ বি’ষয়ে নগরীর আজাদ লন্ড্রীর বাসিন্দা মোহাম্ম’দ আলী বাবু বলেন, আমাদের খুলনাকে আধুনিক স্বাস্থ্য-সম্মত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাওয়া হয় কিন্তু তা’ করতে হলে শব্দদূষণ এর দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যত্র-তত্র যখন-তখন মাইক বাজছে এর উচ্চ শব্দ সব ব’য়সী মানুষের উপর ক্ষ’তিকর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে শব্দ দূষণের কারণে অনেক মানুষের শ্রবণশ’ক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে উঠে আসে সাম্প্রতিক এক জরিপে। বাংলাদেশে শব্দ দূষণ নি’য়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কি ধরনের শব্দ আইনত দ-নীয় অ’পরাধ।

শব্দ দূষণকে বলা হয় নীরব ঘা’তক। শব্দ দূষণের বহু উৎস রয়েছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হু’মকি। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্পকারখানা কোন ক্ষেত্রেই শব্দ দূষণ বি’ষয়ে যেসব নিয়ম রয়েছে তা মানা হচ্ছে না।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ স’রকারের পরিবেশ ও বন ম’ন্ত্রণালয়ের শব্দদূষণ (নি’য়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ন’টা থেকে ভোর ছ’টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না।

বাণিজ্যিক এলাকায় তা ৬০ থেকে ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আ’দালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। তবে এর কোনটাই মানা হচ্ছে না।

এ বি’ষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক এস এম ফরিদ উজ্জামান বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডেসিবেল এর বেশী শব্দ হলে মানুষের মধ্যে বির’ক্তি তৈরী হয় যা তার মনের উপর বিরূপ প্রভাব ফে’লে। এর ফলে তার মন মেজাজ খা’রাপ হয়ে উ’ত্তেজনা তৈরী করে এবং মা’নসিক স্বস্তি ন’ষ্ট হয়। যার প্রভাব পড়ে তার পরিবার ও সমাজের উপর।

তিনি বলেন, বর্তমানে যানবাহনের শব্দ ও হর্নের সাথে বাড়ছে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় প্রতিটি অনুষ্ঠানের শব্দ দূষণ এর সাথে যোগ হয়েছে যথেচ্ছ ক্যানভাস। এখনই যদি এর নিয়ন্ত্রনে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় শব্দ দূষণ সমাজ ও মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলিপ কুমার দত্ত বলেন, শব্দ আসলে একটা মানুষকে অ’সুস্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন,

শব্দ দূষণ মানুষের মনের উপর সরাসরি প্রভাব ফে’লে এবং তার যে কোন বি’ষয়ের উপর মনোযোগ ন’ষ্ট করে, যার ফলে কাজের পাশাপাশি মনের উপরও ক্ষ’তিকর প্রভাব ফে’লে যা মনোরো’গের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, যেহেতু পরিবেশ ও বন ম’ন্ত্রণালয়ের শব্দদূষণ (নি’য়ন্ত্রণ) বিধিমালা রয়েছে এ বি’ষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেয় তবে এর নি’য়ন্ত্রণ সম্ভব।

শব্দ দূষণ বি’ষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক সাইফুর রহমান খানের সাথে যেগাযোগ করলে তিনি বলেন, “এবি’ষয়ে তার কাছে এই মুহূর্তে কোন ত’থ্য নেই।” খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী বায়ো কেমিষ্ট, নরেশ চন্দ্র বিশ^াস জানান, “খুলনায় নিয়মিত শব্দের মান পরীক্ষা করা হয়।

বিস্তারিত জানতে চাইলে বলেন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে আবেদন করলে ত’থ্য পাওয়া যাবে।”খুলনা রূপসা শিরগাতি গ্রামের অন্ধ মোজাম শেখ মাইক কিনেছেন ২২’শ টাকা দিয়ে ভিক্ষা করার জন্য।

মাইকে বাজছে, “ও মা’রা বাবারা আমার দুইডা চক্ষু নাই, বাবারা আপনাদের সামনে হাত পাতছি, বাবারা আল্লার রওয়াস্তে সাহায্য করুন বাবারা।” আয় ভালো স্ত্রী’কে নিয়ে হেঁটে হেঁটে মাইকিং করে দৈনিক ভিক্ষা করে পান ৫’শ থেকে ৭’শ টাকা।

খুলনার গোবরচাকা মধ্যপাড়ার মোঃ মিন্টুর ভ্যানের মাইকে সারাদিন বাজতে থাকে “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আমির ভাইয়ের ইঁদুর মা’রা মহা বি’ষ টোপ। জি হ্যা পথচারি ভাই বন্ধু এই সেই বিখ্যাত আমির ভাইয়ের ইদুর মা’রা মহা বি’ষ টোপ। যা ব্যবহারে আপনার ঘরের ইঁদুর, তেলাপোকা, উইপোকা, পিপড়া, ছারপোকা, মাথার উকুন, গরুর আঁঠালি মা’রতে পারবেন।

তিন প্যাকে মাত্র কুড়ি টাকা।” মিন্টু জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এভাবেই বিক্রি করছেন। তিনি জানান, দিনে এক থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি হয়।নরগীতে অধিকাংশ ইলেকট্রোনিক্স দোকানে মাইক এখন নিয়মিত একটি বিক্রি হয় বলে জানান খুলনার ব্যবসায়ীরা।

দামও অনেক কমেছে। খুলনার আশা ইলেকট্রোনিক্স এর দায়িত্বে থাকা আশিক রহমান বলেন, তাদের কাছে সব ধরনের মাইক ও স্পিকার পাওয়া যায়। যার অধিকাংশই ভারত ও চায়না থেকে আসে। তিনি জানান, বর্তমানে হকার ও ভিক্ষুকদের কাছে হ্যান্ড মাইকের চা’হিদা বেশী। দাম ৮’শ থেকে ২৫’শ পর্যন্ত বিভিন্ন সাইজের পাওয়া যায়।

নগরবাসী অ’তিষ্ঠ হলেও প্রতিকারে নেই কোন উদ্যোগ। এ বি’ষয়ে খুলনা সিটি ল’কলেজের শিক্ষক নাগরিক নেতা এ্যাড. কুদরত-ই-ক্ষুদা বলেন, নগরীতে শব্দ দূষণ এখন মানুষের কাছে আ’তঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, এ বি’ষয়ে আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন ও পু’লিশ প্রশাসনকে জানিয়েছি তবে কোন প্রতিকার হয়নি। তিনি বলেন, এগুলো নি’য়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আম’দানি বন্ধ করতে হবে। তাহলেই এর ব্যবহার কমতে পারে। না হলে যেভাবে শব্দ দূষণ চলছে তাতে আগামী প্রজ’ন্ম প্রতিবন্ধিতে পরিণত হবে।

About tanvir

Check Also

ভো’ট চা’ইতে গিয়ে গ;ণ’ধ;র্ষ;ণে;র শি’কার ম’হিলা প্রা’র্থী

প’টুয়াখালীর মি’র্জাগঞ্জে সংরক্ষিত এক না’রী কা’উ’ন্সিলর প্রার্থীকে (৪৫) গ;ণধ;র্ষ;ণের অ;ভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার (১৬ জানুয়ারি) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *